অধিবিদ্যার স্বরূপ ব্যাখা করো

      

       অধিবিদ্যার স্বরূপ ব্যাখা :

 ভূমিকা

অধিবিদ্যা, আনবিদ্যা ও যুক্তিবিদ্যা দর্শনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। অধিবিদ্যা অতীন্দ্রিয় বিষয়াবলী অর্থাৎ বিশ্ব জগতের মূল উপাদান বা গলা সম্পর্কীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে।

জ্ঞানবিদ্যা জ্ঞানের সম্ভাব্যতা, সীমা, শর্ত ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে। আর যুক্তিবিদ্যা চিন্তার নিয়মাবলী সম্পর্কে আলোচনা করে। দর্শন চায় জগৎ ও জীবনের সঠিক জ্ঞান অর্জন করে

জীবন-জগতের মর্মার্থ উদ্ধার করতে। আর এজন্যই অধিবিদ্যা, জ্ঞানবিদ্যা ও যুক্তিবিদ্যা দর্শনের অবিচ্ছেদ্য শাখা হয়ে পড়ি। 

অধিবিদ্যার সংজ্ঞা

যে বিদ্যা জগৎ ও জীবনের নিচ্ছিত তত্ত্ব বা সত্তার স্বরূপ নির্ধারণের চেষ্টা করে তাকে অধিবিদ্যা বলে। অধিবিদ্যার প্রধান কাজ হলো সবার স্বরূপ নির্ণয় করা। সত্তার স্বরূপ অনুসন্ধানের জন্য অধিবিদ্যা জ্ঞানের স্বরূপ বা প্রকৃতি ও জ্ঞানের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা করে।

জ্ঞান বিদ্যার সংজ্ঞা

যে বিদ্যা জ্ঞানের উৎপত্তি, স্বরূপ, সীমা, শর্ত ও বৈধতা নিয়ে আলোচনা করে তাকে জ্ঞানবিদ্যা

যুক্তিবিদ্যার সংজ্ঞা :  

যে বিদ্যা অনুমানমূলক আানের শুদ্ধতা বা বৈধতার প্রকৃতি, পদ্ধতি ও প্রকার নিয়ে আলোচনা করে তাকে যুক্তিবিদ্যা বলে। এখন আমরা দর্শনের এই তিনটি শাখার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দার্শনিক আলোচনার ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো।

অধিবিদ্যা ও জ্ঞানবিদ্যা কান্টের মত

বিশ্বজগৎ, জীবন ও পরম সত্তার স্বরূপ সম্পর্কে আলোচনা করা অধিবিদ্যার কাজ। আনবিদ্যার কাজ জ্ঞানের স্বরূপ, উৎপত্তি, সম্ভাবনা, শর্ত ও সীমা নিয়ে আলোচনা করা। কিভাবে জ্ঞানের উৎপত্তি হয়, জ্ঞান আদৌ সরব কি না, আমাদের জ্ঞানের সীমা কতদূর, যথার্থ জ্ঞানের শর্ত কি কি? এসব প্রশ্ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে জ্ঞানবিদ্যা। অর্থাৎ জানের সমালোচনাই হলো বিদ্যা অধিবিদ্যা ও সম্পর্ক । তয় আনশাখা পরস্পরের পরিপূরক। প্রাচীন দার্শনিকগণ অবশ্য অধিবিদ্যার আলোচনায় জ্ঞানবিদ্যার আলোচনাকে অপরিহার্য মনে করতেন না। কিন্তু কান্ট জ্ঞানবিদ্যার আলোচনাকে প্রাধান্য দান করার পর তাঁর পরবর্তী দার্শনিকবৃন্দ অধিবিদ্যার আলোচনায় জ্ঞানবিদ্যার আলোচনার গুরুত্ব স্বীকার করেন। কান্টের মতে, আমাদের জ্ঞানের বন্ধু হলো অ (Appearance) জ্ঞান অবভাসিত জগতকে অতিক্রম করে যেতে পারে না। কাজেই ভবিদ্যার কোন সার্থকতা নেই। কাট দর্শনের সংজ্ঞা দিতে দিয়ে বলেন যে, দর্শন হলো জ্ঞান সম্পর্কীয় বিজ্ঞান ও সমালোচনা। কান্টের মতে, জানবিদ্যা আলোচনা করে কতটুকু জানা যায়, আর তা জেনেই অধিবিদ্যায় ত জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে।

অধিবিদ্যা ও জ্ঞানবিদ্যা হেগেলের মত

হেগেলের মতে, অধিবিদ্যা ও জ্ঞানবিদ্যা শেষ পর্যন্ত একই বিদ্যা হতো নাড়ায়। কান্টের পরবর্তী সমস্ত ভাববাদী দার্শনিকই জ্ঞানবিদ্যা ও অধিবিদ্যার সম্পর্ক বিষয়ে অনেকাংশে কান্টের মত শিরোধার্য করেছেন। অবশ্য তাঁরা কান্টের মত পরম সত্য জানা যায় না, এমন কথা বলেননি। জার্মান দার্শনিক হেগেল জ্ঞানবিদ্যা আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে, জ্ঞানই চরম সত্তা। সুতরাং হেগেলের মতে, অধিবিদ্যার আলোচ্য বিষয় চরমত আনই বটে। আবার জ্ঞানবিদ্যা ও জ্ঞান নিয়েই আলোচনা করে থাকে। সুতরাং হেগেল মনে করেন, শেষপর্যন্ত অধিবিদ্যা আর জ্ঞানবিদ্যা একই বিদ্যা ।

অধিবিদ্যা ও জ্ঞানবিদ্যা নব্য 

নন্য বাস্তববাদীরা জ্ঞানবিদ্যা ও অধিবিদ্যার সম্পর্ক বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁদের মতে, জ্ঞানবিদ্যা জ্ঞানের স্বরূপ নির্ধারণ করে, কিন্তু চরমতত্ত্ব যা জের বা জ্ঞানের বিষয় তার কোন পরিচয় দেয়ার ক্ষমতা আনবিদ্যার নেই। তত্ত্ব জ্ঞাননির্ভর নয়, আন থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। জগতের দিকে তাকালেই এ কথার সত্যতা বোঝা যায়। আমরা জগতকে আমাদের চোখের সামনে জানাতিরিক্ত সত্তা নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। সুতরাং জগতে নিহিত তত্ত্ব জ্ঞাননির্ভর হবে কী করে? সুরা না বাস্তববাদীদের মতে, জ্ঞানবিদ্যা ও অধিবিদ্যা সম্পূর্ণরূপে পরস্পর নিরপেক্ষ দুটি বিদ্যা। জ্ঞানবিদ্যা জ্ঞানের স্বরূপ নির্ধারণ করে, আর অধিবিদ্যা জ্ঞানাতিরিক্ত তত্ত্বের স্বরূপ উদ্ভাবন করে। এদের মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই।

অধিবিদ্যার আলোচ্য বিষই অধিবিদ্যা যে সময় বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তাদের মধ্যে জ্ঞান অন্যতম, কিন্তু একমাত্র বিষয় নয়। চরম তাকে আমরা শুধু জ্ঞানগমা বলে মনে করি না, তা আমাদের বাসনা চরিতার্থ করে এবং অনুভূতি কৃষ্ণ করে বলেও মনে করি। সুতরাং তত্ত্ব সম্পর্কীয় আলোচনা কেবলমাত্র জ্ঞানের তাৎপর্য নির্ণয়েই সীমাবদ্ধ নয়, তা আমাদের আচার, আচরণ ও সৌন্দর্যানুভূতিরও তাৎপর্য নির্ণয়ের চেষ্টা করে। সত্য, শিব ও সুন্দর- এই তিনই অধিবিদ্যার আলোচনা কেবলমাত্র সত্য অধিবিদ্যার আলোচনার বিষয় নয়। সুতরাং জ্ঞানবিদ্যা ও অধিবিদ্যা এক হতে পারে না ।। জ্ঞানালোচনার জন্য তত্ত্বালোচনা প্রয়োজন

কারো কারো মতে, যে মানসিক বৃত্তির সাহায্যে জ্ঞান হয় তা জ্ঞানের বিষয় থেকে স্বতভাবেই আলোচনা করা যায়, তাও ঠিক না। কারণ যে বৃত্তির সাহায্যে জ্ঞান হয় তার প্রকৃতি, শক্তি ও সীমা কেবলমাত্র কি কি জানা যায়, সে আলোচনার ভিত্তিতেই নির্ণয় করা সম্ভব। অর্থাৎ তল্লালোচনার ভিত্তিতেই জ্ঞানের তাৎপর্য নির্ণয় করা যায়। অন্ধের প্রকৃতি যেমন তার ব্যবহারের মাধ্যমে জানা যায়, তেমনি জ্ঞানের প্রকৃতি জ্ঞানের প্রয়োগ বা জ্ঞানের বিষয়ের মাধ্যমেই জানা যায়।

 সুতরাং জ্ঞানালোচনা বা আনবিদ্যার জন্য জন্মালোচনা বা অধিবিদ্যা প্রয়োজন। যুক্তিবিদ্যা সঠিক চিন্তাৰ সর্বজনগ্রাহ্য শর্ত নিরূপণ করে অধিবিদ্যা পরম সত্তার যথা স্বরূপ সম্পর্কে জ্ঞানদান করে। অন্যদিকে যথার্থ চিন্তা পদ্ধতি যুক্তিবিদ্যার বিষয়বস্তু যুক্তিবিদ্যা বন্ধু বা পরম সত্তার সম্পর্কে আলোচনা করেনা, আমাদের চিন্তা যাতে যথার্থ হয়, সে সম্পর্কে কতগুলি সর্বজনগ্রাহ্য শর্ত নিরূপণ করে।

কাজেই অধিবিদ্যা বা মুক্তিবিদ্যার নিজ নিজ আলোস বিষয় আছে এবং আলোচ্য বিষয়ের নির্দিষ্ট পরিসর আছে। আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হয়, অধিবিদ্যার আলোচনা যুক্তিবিদ্যার সমস্যার উপর কোন আলোকপাত করে না। যুক্তিবিদ্যার আলোচনাও অধিবিদ্যার সমস্যা সমাধানে কোন করে না।

যুক্তিবিদ্যা অধিবিদ্যার উপর নির্ভনাশীল

চিন্তার সাধারণ প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলেই যে বিষয় সম্পর্কে চিন্তন আলোচনা না করে চিন্তার স্বরূপকে বোঝা যায় না। কাজেই যুক্তিবিদ্যা যেহেতু বন্ধু সম্পৰ্কীয় চিন্তা নিয়েই আলোচনা করে, সেহেতু বস্তুর সাধারণ প্রকৃতি সম্পর্কীয় প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করে। এছাড়া আর একভাবে যুক্তিবিদ্যা অধিবিদ্যার উপর নির্ভরশীল। অন্যান্য বিজ্ঞানের ন্যায়। যুক্তিবিদ্যা চিন্তার কয়েকটি মূল সূত্রকে বিনা প্রমাণে গ্রহণ করে, যেমন তাপাত্মা নিম (The Law of Identity), বিরোধবাধক নিয়ম (The Law of Contradiction), নির্মধ্যম নিয়ম ( The Law of Excluded Middle) পর্যন্ত হেতু নিয়ম (The Law of Sufficient Reason) ইত্যাদি। অধিবিদ্যা এগুলির সত্যতা যাচাই করে দেখে। সুতরাং যুক্তিবিদ্যাকে অধিবিদ্যার উপর নির্ভর করতে হয়

Tags

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.